Is it really?

কাউকে আঘাত করে বা কাউকে ছোট করার জন্য না, কারও অপরাধ ঢাকার জন্য না। কোন ব্যক্তিবিশেষকে উদ্দেশ্য করে না, কোন ব্যাক্তিবিশেষকে সমর্থন করে না। অনেকদিন হল ভাবছি যে এটা লিখব, হয়ে ওঠেনা। আজ বসেই পড়লাম।

আমি পড়েছি বরিশাল মেডিকেল কলেজে, ইন্টার্নই করেছি হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট কলেজ হাসপাতালে। কিছুটা সময় কাজ করেছি বারডেম হাসপাতালে। এই বিভিন্ন জায়গায় কাজের সুবাদে অনেক অনেক ডাক্তারের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য হয়েছে। অনেক ধরণের রুগীও দেখেছি। যে আপুরা ডাক্তারি করেন বা চিকিৎসা সেবার সাথে জড়িত, তারা জানেন যে রুগীর কতো ভেরিয়েশন থাকে। আমার ইন্টার্নই করার সময়ে কখনো কোন প্র্যাক্টিকাল ম্যানুভার করার আদেশ পাইনি, কিন্তু নার্স স্টেশনে বসে থাকতাম অন-কল থাকলে, যাতে নতুন রুগী আসলেই প্রসিডিউরগুলা করতে পারি। স্টিচ দেয়া, খুলা, ক্যানুলা হাতে ঢুকানো, নাকে নল দেয়া, লাংস বা হার্ট থেকে পানি বের করা, পেটের পানি বের করা, মাথার ভেতরে যেই ফ্লুয়িড থাকে সেটাকে বের করা, ডায়ালাইসিসের চ্যানেল বানানো, সিজার অপারেশন (একটা অপারেশনের ৮৫%), এনেস্থেশিয়া দেয়া-সেটা থেকে রুগীর গ্যান ফিরানো এগুলো সবই করেছি। আমার সরকারী মেডিকেলে ইন্টার্নই করা বন্ধুরা হয়তো বেশী করেছে, কিন্তু আমিও করেছি। এবং আমি আমার সাথে ইন্টার্নই করা মানুসগুলাকে দেখে বুঝেছি যে অন্তত ৬০% মানুষও এগুলো করেছে, আন্তরিকতা নিয়েই করেছে। খুব স্নব কোন মেয়ে/ছেলে ডাক্তার যাকে দেখলে একেবারেই “ফার্মের মুরগি” মনে হয়, তারাও রুগি (সে যেই লেভেলের রুগিই হোকনা কেন) যখন দেখেছে অনেক আন্তরিকতা নিয়ে দেখেছে। একজনের সাথে কাজ করেছিলাম (তাকে একটুও পছন্দ করতাম্না) যে একটা রুগীর ঘরে বাজে গন্ধ দেখে যেতে চাইতনা, কিন্তু এক পেশেন্ট মারা যাওয়ার পর (কষ্টে রুগিটার বাথরুম হয়ে গেছিল) ডেডবডির নিচ থেকে পায়খানা পরিস্কার করেছিল যাতে দেহের গায়ে ময়লা না লেগে থাকে। যারা খ্যাপে যেত তারাও খ্যাপ খাটার পাশাপাশি নিজের হাসপাতালের রুগিও কম যত্ন নিয়ে দেখেনাই। রাতের বেলা ইমারজেন্সি কল আসলে বিরক্ত হয়েছে (ইন্টার্নই থেকে শুরু করে প্রফেসর পর্যন্ত সবাই) কিন্তু রুগি দেখতে আসেনাই এমন হয়নি কখনো। একটা অপারেশন যখন চলে, ওটির ভেতরে যে কি চলে এটা যারা ভিতরে না থাকে তারা বুঝবেনা। একজন ডাক্তার যখন একটা রুগিকে কোন ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করে তখন ক্যালকুলাস অঙ্কের মত কত হিসেব যে চলে যে তার ইয়ত্তা নাই। ৪০ বছর ডাক্তারি করছে এমন মানুষকেও ওষুধ/ব্যবস্থা প্রেস্ক্রাইব করার আগে চিন্তা করতে হয়। রোগের ধরন, রুগীর ধরন, রোগের আগের অবস্থা, রোগ ধরা পড়ার পরের অবস্থা, আগের ওষুধ, ওষুধের ডিউরেশন, রোগীর কমপ্লায়েন্স, রোগীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি অনেক কিছু। আমাদের দেশের ডাক্তারেরা রুগি বেশী, কাজ বেশী, পয়সা কম-এই দুষ্টচক্রের মাঝে আটকে থাকে দেখে আমরা সাধারণ মানুষেরা তাঁদের ব্যাবসায়ি মনোভাবটাই বেশী নজরে আনি। কিন্তু একজন সার্জারির প্রফেসরের সাথে কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, উনি যখন সার্জারি করতেন উনার মাথায় চিন্তাগুল ছিল এমন- সারাদিন কলেজে-হাস্পতালে ক্লাস নিয়েছি-রুগি দেখেছি, টায়ার্ড, টিনেজ মেয়েটা কয়দিন ধরে মুড নিয়ে আছে, ছেলেটা ঘরের দরজা সবসময় লক করে থাকে-খবর নিতে হবে, বাবার সুগার কন্ট্রোল হচ্ছেনা, মায়ের প্রেশার বেশির দিকে, ভাইয়ের ছেলের বিয়ের কথা হচ্ছে-একমাত্র ফুপু হিসেবে থাকতে হবে, মেয়ের এসএসসি পরিক্ষা সামনে, বাসা ভাড়া কালেক্ট করতে হবে-সাথে মেইন্টেনেন্সের কাজ করাতে হবে, পরশু একটা বিয়ের দাওয়াত আছে-গিফট ঠিক করতে হবে, গ্রাম থেকে মানুষ এসেছে চিকিতসার জন্য-কথা বলতে হবে-ডাক্তার দেখাতে হবে, অমুকের সাথে অনেকদিন যোগাযোগ নাই-অসামাজিকতার লেবাস লেগে গেছে-তার অভিমান ভাঙ্গাতে হবে, সকালে লেকচার আছে-পড়তে হবে, পরীক্ষার খাতা দেখা হয়নি, সকালে গাড়ি লাগবে কিন্তু ছেলের কোচিং আছে একই সময়ে, বুয়া আসেনাই-বাসায় গিয়ে রান্না করতে হবে, নিজের প্রমোশন/নলেজ লাভের জন্য কিছু একটা করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এটাত শুধু ভিজিবল চিন্তা। সবথেকে বড় চিন্তা এই রুগীটার অপারেশন ভাল্ভাবে শেষ করতে হবে, গ্যান ফিরল কিনা দেখতে হবে, যারা এসিস্ট করছে তাঁদের কিছু শিখাতে হবে, নির্দিষ্ট সময় পর এই রুগিটার একটা ফলো আপ নিতে হবে। এবংএই রুগিটাই একমাত্র রুগী না, তাঁকে আরও (একেবারেই কমপক্ষে/বেয়ার মিনিমাম) ২০-৩০জন রুগিকে দেখতে হয়েছে দিনে। এদের আবার একেকজনের চিকিৎসা একেকরকম, রোগের প্রগ্নসিস একেকরকম। ডাক্তারের ব্যাক্তিগত, শারীরিক সকল সমস্যার কথাত বাদই দিলাম এখানে বলতে। জুনিওর ডাক্তার হলেত আরও দুনিয়ার প্যারা- এগুলার সাথে ডিগ্রি, পোস্টিং, পয়সার অভাব এগুলাও যোগ হয়। এতগুলা জিনিস একটা মানুষের মাথায় চলে। একদিন-দুইদিন এক ঘন্টা-দুই ঘন্টার জন্য না, সারা জীবন। এই চিন্তাগুল সকল ডাক্তারের মাথাতেই চলতে থাকে। তা তিনি খুব ন্যায়সঙ্গত মানুষ হন বা “কসাই” ডাক্তার হন। ব্যাবসায়ি ডাক্তার চিন্তা করলে ওদের কথাত এমন হবে যে এই রুগীর ঝামেলা হলে, সুনাম কমে যাবে, রুগী কমে যাবে, পয়সা কমে যাবে। আমি আমার জীবনে এমন কোন ডাক্তার দেখি নাই যে সগ্যানে চিকিৎসায় অবহেলা করেছে। রগচটা, চামার, অহঙ্কারি হতে পারে, আন্তরিকতা হয়তো কম, কিন্তু পয়সার লোভেই হোক বা নামের লোভেই হোক বা সেবা করার উদ্দেশ্যই হক-এটা যদি স্বয়ং হিপক্রেটিস এসেও বলে যে ডাক্তার রুগিটাকে ভাল করতে চায়নাই, আমি বিশ্বাস করবোনা।
আমি ব্যাক্তিগতভাবে প্রাইভেট হাসপাতাল পছন্দ করিনা। কিন্তু ওদের বুর্জোয়া মনোভাব আছে বলেই রুগিকে চিকিৎসা না দেয়া/অবহেলার যুক্তি আমি মানতে পারিনা। যত ফেমাস হাসপাতালই হোকনা কেন একটা বেখেয়াল কাজ তাদের গুডউইল নষ্ট করে আর তার ফলে ব্যাবসাও নস্ত-এই লোকসান তারা হতে দিবে বলে মনে হয়না।
একটা রোগীর যখন “ক্রিটিকাল” অবস্থা থাকে তখন কোন ডাক্তার এমন নাই যে সেই অবস্থায় “ইগ্নর” করে। হয়তো রুগীর এতেন্ডেন্টের সাথে এপ্রচ ভাল থাকেনা, কিন্তু রোগীকে কষ্ট দিচ্ছে এমন কোন কাজ ইচ্ছায় (বা গা না করার জন্য) কেউ করবেনা। আইসিইউ/সিসিইউ/এইচডিইউ তে প্রতিটা মিনিটই কিন্তু রেস। ভেতরের অবস্থাটা গ্রে’জ এনাটমি বা হাউজের মতো একদমই না। আমরা সবাই চাই কাছের মানুষ বা নিজে অসুস্থ্য হলে একেবারে এক্সপার্ট সবাই দেখুক, কিন্তু এই এক্সপার্টিজ কিন্তু একদিনে আসেনা। অনেক অধ্যবসায় লাগে, অনেক প্র্যাকটিস লাগে। তাছাড়া মেডিকেল বিদ্যা যতই এডভান্স হোকনা কেন, শরীরবিদ্যা কিন্তু এখনো অনেকটাই অজানা। সামান্য প্যারসিটামল ওষুধই একেকজনের মাঝে একেক রকম কাজ করে, কোম্পানি-ব্র্যান্ড, দাম ভেদেতো আকাশ পাতাল তফাৎ! একবার শুধু ভাবেন যে আপনার কোন সুস্থ বন্ধুর ধুলায় এলারজি, আপ্নিও সুস্থ কিন্তু আপনার ধুলায় সমস্যা নাই। সামান্য ধূলিকণা মানুশে মানুশে সুস্থ অবস্থাতেই এত ভিন্ন অবস্থা তৈরি করে। আর সেখানে বড় ইফেক্টের কোন ওষুধ কত ভিন্নতা আনে একবার ভাবুন। আর তার উপর প্রতিটা রোগের একটা জেনেটিক প্রিডেসপজিশন থাকে, জমজ মানুষের মাঝেও একটা জিনের হাজার ভাগের একভাগের ভিন্নতার জন্য আকাশপাতাল ফারাক হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আপ্নার-আমার মতই আরেকটা মানুষ যে কিনা সর্বজ্ঞ নয়, শুধু বিদ্যা অর্জন করেছে একটা বিশেষ বিষয়ের-সে কিভাবে নিশ্চিত হতে পারবে! আমি মানি বেশীরভাগ ডাক্তারের ব্যাবহার জঘন্য। আর তার জন্য এই প্রফেশনের খুব খুব খুব ছোট্ট একটা পার্টের মানুষ হয়ে আমি ক্ষমা চাইতে পারি, কিন্তু কেন যেন “ডাক্তারের অবহেলায় রুগী মারা গেল” এই কথাটা মানতে পারিনা।
যখন কাছের কেউ কষ্ট পায়, আমাদের ছেড়ে চলে যায় আমাদের করার কিছু থাকেনা। খারাপ লাগাগুলো ইন্টেন্সিফাইড হয়। তখন সামনে যদি সেই মানুষটা থাকে যার উপর ভরসা করা হয়েছিল, বিশ্বাস করা হয়েছিল, এক্সপেক্ট করা হয়েছিল, দুঃখটা রূপ বদলে রাগ হয়ে সেই মানুস্টার উপর পড়ে। একবার ভাবেন তো, আপনার আমার মতই আরেকটা মানুষ, যে নিঃশ্বাস নেয়, খুধা লাগ্লে খায়, শারীরিক চাহিদাও সব আমাদের মতই, যার জীবনেও সুখদুঃখ আছে, স্বপ্ন আর আশা আছে সে কিভাবে আরেকজন রক্তমাংসের মানুষ মারা যাচ্ছে এমন সময় তার কষ্ট কমানোর চেষ্টা না করে পারে! একটা জিবন চলে যাচ্ছে, এসময় একেবারে সিরিয়াল কিলার না হলে সেটা ইগ্নর করা কি সম্ভব?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s